অবসরের পর রায় লেখা সংবিধান পরিপন্থি: প্রধান বিচারপতি

অবসরের পর রায় লেখা সংবিধান পরিপন্থি: প্রধান বিচারপতি

রায় লিখতে কোনো কোনো সহকর্মীর দেরিতে উষ্মা প্রকাশ করে বিচারিক এই দায়িত্ব কর্মজীবনেই শেষ করতে তাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা।

“কোনো কোনো বিচারপতি রায় লিখতে অস্বাভাবিক বিলম্ব করেন। আবার কেউ কেউ অবসর গ্রহণের দীর্ঘদিন পর পর্যন্ত রায় লেখা অব্যাহত রাখেন, যা আইন ও সংবিধান পরিপন্থি।”

বাংলাদেশের বিচারাঙ্গনের সর্বোচ্চ ব্যক্তি হিসেবে নিজের দায়িত্ব নেওয়ার এক বছর পূর্তি উপলক্ষে দেওয়া এক বাণীতে একথা বলেন বিচারপতি সিনহা।

বাংলাদেশের ২১তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে ২০১৫ সালের ১৭ জানুয়ারি শপথ নিয়েছিলেন বিচারপতি সিনহা। চার পৃষ্ঠার বাণীতে এক বছরের দায়িত্ব পালনের নানা দিক তুলে ধরেন তিনি।

নিষ্পত্তি হওয়ার মামলার রায় ‘যৌক্তিক’ সময়ে লেখা শেষ করতে সহকর্মীদের রাজি করাতে ব্যর্থতার কথা স্বীকার করেন বিচারপতি সিনহা।

অবসরের পর রায় লেখা বেআইনি বলার ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, “কোনো বিচারপতি অবসর গ্রহণের পর তিনি একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে গণ্য হন বিধায় তার গৃহীত শপথও বহাল থাকে না।

“আদালতের নথি সরকারি দলিল। একজন বিচারপতি অবসরগ্রহণের পর আদালতের নথি নিজের নিকট সংরক্ষণ, পর্যালোচনা বা রায় প্রস্তুত করা এবং তাতে দস্তখত করার অধিকার হারান।”

“আশা করি বিচারকগণ আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে এমন বেআইনি কাজ থেকে বিরত থাকবেন,” সহকর্মীদের প্রতি প্রত্যাশা রাখেন প্রধান বিচারপতি।

আপিল বিভাগ থেকে কয়েক মাস আগে অবসরে যাওয়া বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী অভিযোগ করেছিলেন, রায় লেখা শেষ না করায় তার পেনশন আটকে দিয়েছিলেন প্রধান বিচারপতি।

অতীতে অনেক বিচারপতি তা করলেও তার ক্ষেত্রে ‘অন্যায় আচরণ’ করা হয়েছে অভিযোগ তুলে প্রধান বিচারপতি সিনহার অভিশংসনও চেয়েছিলেন বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী।

গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় বিচার বিভাগের গুরুত্ব তুলে ধরে প্রধান বিচারপতি তার দায়িত্ব নেওয়ার পর মামলাজট নিরসন এবং মামলা-মোকদ্দমা দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে নেওয়া নানা পদক্ষেপের কথা বলেন বাণীতে।

কোনো জটিলতা দেখা দিলে আইনজীবীরা আদালত বর্জন না করে সমস্যাটি জানালে দ্রুততার সঙ্গে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।

রাষ্ট্রের ‘চতুর্থ স্তম্ভ’ হিসেবে গণমাধ্যম আইনের শাসন ও ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠায় দেশবাসীকে সচেতন করার দায়িত্বটি পালন করে যাবে বলে প্রত্যাশা রেখেছেন তিনি।

মামলা ব্যবস্থাপনায় সংস্কার এবং দক্ষ সেবাদানের জন্য তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর বিষয়টিও তুলে ধরেন বিচারপতি সিনহা।

সুপ্রিম কোর্টে অনলাইনে কজলিস্ট প্রকাশ, অনলাইনে উচ্চ আদালত কর্তৃক দেওয়া জামিন সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার ব্যবস্থা প্রবর্তন, সুপ্রিম কোর্ট অনলাইন বুলেটিনে আপিল বিভাগ ও হাই কোর্ট বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ রায় এবং সেগুলোর রেসিও ডিসাইডেন্ডি হেডনোট আকারে প্রকাশের কথা বলা হয় বাণীতে।

উচ্চ ও নিম্ন আদালতে ই-কোর্ট ব্যবস্থা প্রবর্তনের লক্ষ্যে একটি প্রকল্প প্রক্রিয়াধীন বলেও জানান প্রধান বিচারপতি।

সুপ্রিম কোর্ট ডে-কেয়ার সেন্টার প্রতিষ্ঠা, সুপ্রিম কোর্টের জাদুঘরের আধুনিকায়ন, মেডিকেল সেন্টারের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি ও অসহায় বিচারপ্রার্থীদের সরকারি আইনি সহায়তা দিতে সুপ্রিম কোর্টে লিগ্যাল এইড অফিস স্থাপনের কথাও বলেন তিনি।

মামলা নিষ্পত্তির হার বেড়েছে

এক বছরের পদক্ষেপে নিম্ন আদালত থেকে উচ্চ আদালতে মামলা নিষ্পত্তির হার গত বছরের তুলনায় অনেক বেড়েছে বলে উল্লেখ করেন প্রধান বিচারপতি।

তিনি বলেছেন, ২০১৫ সালের ১৭ জানুয়ারি থেকে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত আপিল বিভাগে মামলা নিষ্পত্তির সংখ্যা ৯ হাজার ৩৫৬টি, যা গত বছর ছিল ৫ হাজার ৭৮৯টি।

অর্থাৎ এই সময়ে সর্বোচ্চ আদালতে মামলা নিষ্পত্তি ১৬২ শতাংশ বেড়েছে।

হাই কোর্ট বিভাগে ২০১৫ সালের নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিষ্পত্তি হওয়া মামলার সংখ্যা ৩৩ হাজার ৩৮০টি, ২০১৪ সালে নিষ্পত্তি হয় ২২ হাজার ৪৭৭টি। এক্ষেত্রে নিষ্পত্তির হার বেড়েছে ১৪৯ শতাংশ।

২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত বাংলাদেশের বিভিন্ন আদালতে মোট ১০ লাখ ৬৭ হাজার ৭৩৩টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। ২০১৪ সালের এসময়ে নিষ্পত্তির সংখ্যা ছিল ৯ লাখ ৯৭ হাজার ৬৫২টি। এক্ষেত্রে তুলনামূলক মামলা নিষ্পত্তির হার ১০৭ শতাংশ।

“সরকার, বিচারক, আইনজীবী, বিচারপ্রার্থী জনগণ তথা দেশবাসীর পূর্ণ সহযোগিতা পেলে বিদ্যমান মামলাজট দ্রত নিরসন সম্ভব হবে,” বলেছেন বিচারপতি সিনহা।