সাত মাসে বাপেক্সের অগ্রগতি সামান্যই | ইবিডি নিউজ

সাত মাসে বাপেক্সের অগ্রগতি সামান্যই

বাপেক্সসরকার প্রাকৃতিক গ্যাসের অনুসন্ধান ও উত্তোলনে যথেষ্ট বরাদ্দ দিলেও সময়মতো তা ব্যয় করতে পারছে না অনুসন্ধান-উত্তোলন কোম্পানি বাপেক্স। ২০১৭-১৮ অর্থবছরের সাত মাসে বেশিরভাগ প্রকল্পের অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ২০ শতাংশ। কোনও কোনও প্রকল্পের একটি টাকাও খরচ করতে পারেনি তারা। সরকারি প্রতিষ্ঠানটির কয়েকটি প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যালোচনা করে হতাশাজনক এ তথ্য পাওয়া গেছে। অথচ প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকার বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। জ্বালানি বিভাগের সংশিষ্ট সূত্র জানায়, বাপেক্সের প্রকল্পগুলোর কাজ শেষ হলে এ বছরের জুনের মধ্যে প্রতিদিন ১৬২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হতো। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) অন্তর্ভুক্ত বাপেক্সের প্রকল্পগুলোর কাজের গতি বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

জ্বালানি বিভাগের একজন কর্মকর্তা বলেন, একটা সময় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে বরাদ্দ পাওয়া যেত না। এখন সরকার এ খাতে যথেষ্ট বরাদ্দ দিয়েছে। অন্যদিকে, গ্রাহকের অর্থে গ্যাস উন্নয়ন তহবিল গড়ে উঠেছে। এই তহবিল থেকেও প্রকল্প বাস্তবায়নে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। আর্থিক বরাদ্দ দেওয়ার পরও কেন প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সম্প্রতি জ্বালানি সচিব নাজিম উদ্দিন চৌধুরী এক বৈঠকে প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীর গতির কারণে সংশ্লিষ্টদের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

জ্বালানি মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, এডিপিভুক্ত ২-ডি সাইসমিক সার্ভের ওভার এক্সপ্লোরেশন ব্লক ৩বি, ৬বি ও ৭ শীর্ষক প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয় ১৮৮ কোটি টাকা। গত ডিসেম্বর পর্যন্ত এ প্রকল্পের কোনও অর্থ ব্যয় করতে পারেনি বাপেক্স। দ্রুত এই প্রকল্পের কাজ শুরু করার নির্দেশ দিয়েছে জ্বালানি বিভাগ। সম্প্রতি জ্বালানি বিভাগের এক বৈঠক থেকে এই নির্দেশনা দেওয়া হয়।

রূপকল্প-৯: ২ডি সাইসমিক প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১২৩ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের এডিপিতে এই প্রকল্পের ৬৭ কোটি ৮২ লাখ টাকা টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও এখনও কোনও টাকা খরচ করতে পারেনি বাপেক্স। গত সাত মাসে এই প্রকল্পের আর্থিক অগ্রগতি মাত্র ৭ দশমিক ৪২ শতাংশ। একে হতাশাজনক হার বলে মনে করছে জ্বালানি বিভাগ। প্রকল্পের অগ্রগতি দ্রুত করতে কর্মপরিকল্পনা করার নির্দেশ দেওয়া হয়।

তিতাস, হবিগঞ্জ, নরসিংদী ও বাখরাবাদ গ্যাসক্ষেত্রে ৭টি কূপের ওয়ার্কওভার প্রকল্পের মোট ব্যয় ৩৫৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এর মধ্যে এ অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল ১৩ কোটি ১০ লাখ টাকা। ডিসেম্বর পর্যন্ত কোনও অর্থ ব্যয় হয়নি। প্রকল্পের অগ্রগতি মাত্র ৫ দশমিক ৫৩ ভাগ। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ২০১৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে অতিরিক্ত ১৫ থেকে ২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু এখন তা অনিশ্চিত হয়ে পড়লো।

রূপকল্প-৫ খনন প্রকল্প: ২টি অনুসন্ধান কূপ (শ্রীকাইল নর্থ-১ ও মোবারকপুর সাউথ ইস্ট-১), ১টি মূল্যায়ন এবং উন্নয়ন কূপ (বেগমগঞ্জ-৩) নামের প্রকল্পটির মোট ব্যয় ৩০ হাজার লাখ টাকা। এর মধ্যে চলতি বছর ৪২ কোটি ৬ লাখ টাকা খরচ করার কথা থাকলেও গত সাত মাসে এক টাকাও খরচ করতে পারেনি বাপেক্স।

জানা যায়, প্রকল্পটির মাধ্যমে চলতি বছরের জুন মাসের মধ্যে ২টি অনুসন্ধান কূপ, ১টি উন্নয়ন কূপ এবং ১টি ওয়ার্কওভার কূপ খনন করার কথা। এর মাধ্যমে ২৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার কথা থাকলেও কাজের অগ্রগতি না হওয়ায় এখন আর তা সম্ভব হচ্ছে না।

রূপকল্প ৪ খনন প্রকল্প : ২টি অনুসন্ধান কূপ (শাহবাজপুর পূর্ব-১ ও ভোলা উত্তর-১) এবং ২টি ওয়ার্কওভার কূপ শাহবাজপুর নামের প্রকল্পটির চলতি বছর বরাদ্দ ছিল ২২৩ কোটি টাকা। ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে মাত্র ৬৫৭ লাখ টাকা, যা মোট ব্যয়ের মাত্র ২ দশমিক ৯৫ ভাগ। এই প্রকল্পের মাধ্যমে এ বছরের জুনের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে ৩৯ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার কথা ছিল।

রূপকল্প ৩ খনন প্রকল্প: ৪টি অনুসন্ধান কূপ (কসবা-১, মাদারগঞ্জ-১, জামালপুর-১ ও শৈলকুপা-১) শীর্ষক প্রকল্পের বরাদ্দ ছিল ১০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যয় হয়েছে মাত্র ১ কোটি ১১ লাখ টাকা। অর্থাৎ অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ১ দশমিক ১১ ভাগ। এই প্রকল্প নির্ধারিত সময়ে বাস্তবায়িত হলে জুনের মধ্যে প্রতিদিন ২৪ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার কথা। কিন্তু এখন তা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

রূপকল্প ২ খনন প্রকল্প: ৪টি অনুসন্ধান কূপ (সালদা নদী দক্ষিণ-১, সেমুতাং-দক্ষিণ-১, বাতচিয়া-১ ও সালদা নদী পূর্ব-১) শীর্ষক প্রকল্পের জন্য মোট বরাদ্দ দেওয়া হয় ১২০ কোটি টাকা। কিন্তু ব্যয় হয়েছে মাত্র ৫৩ লাখ টাকা। অর্থাৎ অগ্রগতি মাত্র দশমিক ৪৪ শতাংশ। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে জুনের মধ্যে প্রতিদিন ২৩ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হতো।

রূপকল্প ১ খনন প্রকল্প: ৩টি অনুসন্ধান কূপ (হারারগঞ্জ-১, শ্রীকাইল ইস্ট-১ ও সালদা নর্থ-১) ও ২টি উন্নয়ন কূপ (শ্রীকাইল নর্থ-২ ও কসবা-২) শীর্ষক প্রকল্পের অগ্রগতি হয়েছে মাত্র দশমিক ২৭ ভাগ। এটিও বাস্তবায়িত হলে প্রতিদিন ৩০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যেতো। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ শামসুল আলম বলেন, বিদ্যুৎ প্রকল্পের তুলনায় জ্বালানি প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি বরাবরই কম। এক্ষেত্রে সমন্বয় থাকা জরুরি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বাপেক্সকে কাজ করার বিষয়ে আরও গুরুত্ব দিতে হবে। প্রকল্প বাস্তবায়নে দেরি হলে খরচ বেড়ে যায়। তাই খরচ না বাড়িয়ে দ্রুত বাস্তবায়ন কীভাবে করা যায় তার চেষ্টা করা উচিত। এই অবস্থায় বাপেক্সের একটি কর্মপরিকল্পনা করা উচিত। পাশাপাশি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন করতে গিয়ে কী কী সমস্যা হচ্ছে এবং তা সমাধানের জন্য কী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা নির্ধারণ করা দরকার।’